নেত্রকোনার হাওরে কোটি টাকার হাঁসের ডিমের হাট
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার আদর্শনগরে প্রতি সপ্তাহে বসছে হাঁসের ডিমের জমজমাট হাট। হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ডিমের এই বাজারে প্রতি মঙ্গলবার বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে ১০ লাখ ডিম। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, এক দিনের লেনদেনের পরিমাণ প্রায় কোটি টাকা। এই হাটকে ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করছেন হাজারো মানুষ, আর হাওরের ডিম পৌঁছে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে।
চারদিকে বিস্তীর্ণ জলরাশি আর হাওরে হাঁসের বিচরণ—এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ হাঁস পালনের জন্য বেশ উপযোগী। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠেছে ডিম উৎপাদন ও বাণিজ্যের বড় একটি ক্ষেত্র। প্রতি মঙ্গলবার ভোর থেকেই আদর্শনগর হাটে শুরু হয় বেচাকেনা। খামারি, ডিম সংগ্রহকারী ও পাইকারদের ব্যস্ততায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো বাজার।
নেত্রকোনার মদন, খালিয়াজুড়ী ও মোহনগঞ্জসহ বিভিন্ন হাওর এলাকা থেকে খামারি ও ব্যবসায়ীরা ডিম নিয়ে আসেন এই হাটে। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকেও আসে বিপুল পরিমাণ ডিম। বাজারে কেউ ডিম বাছাই করছেন, কেউ ক্যারেট ও ঝুড়িতে সাজাচ্ছেন, আবার কেউ পাইকারদের সঙ্গে দরদাম করছেন। কেনাবেচা শেষে ডিমভর্তি ক্যারেট ও ঝুড়ি ট্রাকে তুলে পাঠানো হয় রাজধানীর তেজগাঁও, খিলগাঁও, খিলক্ষেতসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারে।
স্থানীয়দের মতে, আদর্শনগরের এই হাট এখন শুধু ডিম কেনাবেচার স্থান নয়; এটি হাওরাঞ্চলের মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। হাঁস পালন, ডিম সংগ্রহ, বাছাই, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপেই তৈরি হয়েছে আয়ের সুযোগ। এক জায়গায় বিপুল পরিমাণ ডিম বিক্রির সুবিধা থাকায় খামারি ও পাইকারি ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষই লাভবান হচ্ছেন।
ডিম বিক্রেতা হালিক খান বলেন, নেত্রকোনার বিভিন্ন উপজেলার পাশাপাশি সুনামগঞ্জ থেকেও প্রচুর ডিম এই হাটে আসে। অন্য অনেক জায়গার তুলনায় এখানে ভালো দাম পাওয়া যায়। এ কারণে খামারি ও ব্যবসায়ীদের কাছে হাটটির গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।
তবে এই বাণিজ্যে কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। হাওরের দুর্গম এলাকা থেকে ডিম সংগ্রহ, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ব্যয় এবং দীর্ঘ পথে ডিম ভেঙে যাওয়া বা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি ব্যবসায়ীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। হাটে ডিম কিনতে আসা পাইকারি ক্রেতা জামাল হোসেন জানান, ডিম সংগ্রহ থেকে শুরু করে বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে খরচ হয়। পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে কিংবা বাজারে দাম কমে গেলে লাভের পরিমাণও কমে যায়। তবে নিয়মিত চাহিদার কারণে এই হাটকে কেন্দ্র করে ডিমের বড় বাজার গড়ে উঠেছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নেত্রকোনায় বাণিজ্যিক হাঁসের খামার রয়েছে ১ হাজার ৭৬টি। এর বাইরে প্রান্তিক পর্যায়ে হাঁস পালন করছেন প্রায় ৪৯ হাজার ৭৮৮ জন খামারি বা পরিবার। জেলায় বছরে প্রায় ৪১ কোটি ৭০ লাখ ডিম বিক্রি হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫৬২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এই বিশাল উৎপাদন ও বাণিজ্যে মোহনগঞ্জের আদর্শনগরের সাপ্তাহিক হাট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
নেত্রকোনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম বলেন, হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বিস্তীর্ণ জলাশয় হাঁস পালনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এ অঞ্চলে হাঁসের ডিম উৎপাদনের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। উৎপাদন খরচ কমানো, পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন, খামারিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং বাজারজাতকরণে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা বাড়ানো গেলে এ খাত আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত বাজারব্যবস্থা, উন্নত যোগাযোগ এবং খামারিদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে হাঁসের ডিমের বাণিজ্য হাওরাঞ্চলের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। পাশাপাশি বাড়তে পারে গ্রামীণ মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ। আদর্শনগরের সাপ্তাহিক ডিমের হাট সেই সম্ভাবনারই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
