নোয়াখালীতে শিশুদের পাঠদান পরিত্যক্ত টিনশেড ঘরে
পাকা ভবনে বইয়ের গুদাম
নোয়াখালীর কবিরহাটের মধ্যম সুন্দলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মূল পাকা ভবনে শ্রেণীকক্ষ থাকা সত্ত্বেও শিশুদের পাঠদান করা হচ্ছে একটি পরিত্যক্ত টিনশেড ঘরে। পাকা ভবনটির পাঁচটি কক্ষের দুটিতে গড়ে তোলা হয়েছে পুরো উপজেলার নতুন ও পুরনো উদ্বৃত্ত পাঠ্যবইয়ের স্টোর। ফলে শ্রেণীকক্ষের অভাবে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের যোগসাজশে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বইয়ের এ গুদাম গড়ে তুলেছেন।
সরেজমিন দেখা গেছে, বিদ্যালয়ের ভবন রয়েছে দুটি। এর একটি দোতলা ও পাকা এবং অন্যটি জরাজীর্ণ টিনশেড। বিদ্যালয়ে বর্তমানে শিশু শ্রেণীসহ শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় ২০০। তাদের পাঠদানের জন্য দোতলা ভবনটিই যথেষ্ট। কিন্তু দ্বিতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছে পরিত্যক্ত টিনশেড ঘরে।
বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ, শিক্ষক ও স্থানীয়রা জানান, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯৪৪ সালে। প্রতিষ্ঠাকালীন টিনশেড ভবনে কক্ষ রয়েছে তিনটি। যেটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় ২০১৭ সালে। অন্যদিকে ২০০৫-২০০৬ সালে সরকারিভাবে যে একতলা পাকা ভবন নির্মাণ করা হয়, সেটিতে প্রথমে কক্ষ ছিল দুটি। পরবর্তী সময়ে দোতলা করা হলে সেটিতে কক্ষের সংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচটিতে।
নতুন ভবন নির্মাণের পর সেখানে দুটি কক্ষে প্রথমে দুটি শ্রেণী স্থানান্তর করা হয়। বাকি শিক্ষার্থীরা ২০১১ সাল পর্যন্ত পুরনো তিন কক্ষের টিনশেডেই লেখাপড়া করে। এরপর নতুন ভবনটি দোতলা করা হলে কক্ষসংখ্যাও বাড়ে। কিন্তু সেখানে এখনো সব শিক্ষার্থীকে স্থানান্তর করা যায়নি। ফলে দুটি শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পাঠ নিতে হচ্ছে পরিত্যক্ত ঘোষিত টিনশেড ঘরেই।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দোতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় তিনটির কক্ষের একটি অফিস কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাকি দুটি ব্যবহার করা হচ্ছে শ্রেণীকক্ষ হিসেবে। আর নিচতলায় দুটি বড় কক্ষ থাকলেও সে দুটি তিন বছর ধরে ব্যবহার করা হচ্ছে পুরো উপজেলার উদ্বৃত্ত পাঠ্যবইয়ের গুদামঘর হিসেবে। এ অবস্থায় শ্রেণীকক্ষের অভাবে বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে পুরনো পরিত্যক্ত ঘরেই পাঠদান চলছে শিশুদের।
শিক্ষার্থীরা জানায়, বর্ষা মৌসুমে পরিত্যক্ত টিনশেড ঘরে শিক্ষার্থীদের ভিজতে হয়। শ্রেণীকক্ষে পানি ঢুকে পড়লে পায়ের নিচে ইট দিয়ে বসতে হয়। কোনো কোনো অংশ যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি বলেন, তিন বছর ধরে ওই দুই কক্ষে বই রাখা হচ্ছে। তারও আগে আরো তিন বছর ওই দুই কক্ষ ব্যবহার হতো শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে। অর্থাৎ একতলা ভবন দোতলায় রূপান্তরিত হওয়ার পর থেকেই নিচতলার কক্ষগুলো উপজেলা শিক্ষা অফিসের দখলে চলে যায়।
বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মাহমুদ বিন ওয়াহিদ বলেন, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে তিনি মৌখিক ও লিখিতভাবে জানিয়েছেন। ২০১৬ সালের দিকে তত্কালীন জেলা প্রশাসক বিদ্যালয় পরিদর্শনে এলে তাকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়। তখন তিনি ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিলেও কাজ হয়নি।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাজ্জাদুর রহমান চৌধুরী বলেন, মূলত বছরের শেষের দিকে বই রাখা হয়। জানুয়ারিতে বই বিলি হয়ে গেলে ক্লাস আবার চালু হয়ে যায়। তিনি বলেন, শিক্ষা কর্মকর্তা চেয়েছেন বলেই তিনি শ্রেণীকক্ষে বই রাখার সুযোগ দিয়েছেন। তবে বইগুলো সরিয়ে নিলে শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো হতো।
এ বিষয়ে কবিরহাট উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, ওই স্কুলে বই রাখা ছাড়া তার কোনো উপায় নেই। সেখান থেকে বইগুলো সরানো হলে সেগুলো আবার অন্য কোনো স্কুলেই রাখতে হবে।
উপজেলা পরিষদ ভবনে কেন বই রাখা হচ্ছে না জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরিষদ ভবনে কোনো জায়গা নেই। ফলে বাধ্য হয়ে তাকে মধ্যম সুন্দলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই বই রাখতে হচ্ছে।
