মে’ দিবস আসে মে’ দিবস যায়, কিন্তু শ্রমিকের ভাগ্য পরিবর্তন হয়না

0 193

বিশে^র শ্রমজীবি ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের দীর্ঘকালব্যাপী আন্দোলনের ফসল মে’ দিবস। সারা দুনিয়ার সকল ধরণের শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষের ঐক্যবদ্ধ ও সংহতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে মে’ দিবস। দীর্ঘকাল বঞ্চনা ও শোষণের ফলে শ্রমিক অসন্তোষকে পুঁজিবাদী শ্রেণি কখনো গুরুত্ব না দিয়ে বরং বল প্রয়োগের মাধ্যমে দমন করার চেষ্টা করতো। যুগের পর যুগ এইভাবে চলে আসছে। কিন্তু না আর এভাবে চলতে দেয়া যায় না। শ্রমজীবী মানুষকে মুক্তি দেয়ার লক্ষ্যে ১৮৮৬ সালে ১লা মে তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের ‘হে’ মার্কেটের শ্রমিকরা ৮ ঘন্টা কাজের দাবিতে আন্দোলনে নামেন ঐক্যবদ্ধভাবে। ওই আন্দোলনকে ভূলন্ঠিত করার জন্য শান্তিপূর্ণ জনসভায় মালিক ও সরকারপক্ষের বর্বরোচিত হামলা ও গুলিবর্ষণ-এর মধ্য দিয়ে মে’ দিবসের সূচনা হয়। সেদিন ১০ জন শ্রমিক মৃত্যু বরণ করে, এবং অসংখ্য হতাহতের ঘটনা ঘটে। তাদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে সারা পৃথিবীব্যাপী নিন্দা ঝড় ওঠে। আন্দোলন আরো বেগবান হতে থাকে। জনতার উত্তাল জোয়ার থামিয়ে দিতে পারেনি তৎকালীন শোষকশ্রেণি। ১ লা মে’ শুরু হওয়া ওই আন্দোলন স্থায়ী হয়েছিল আরো বেশ কয়েকদিন। ধর্মঘট চলতেই থাকে সারা। অব্যাহত আন্দোলন করতে গিয়ে ৩ মে’ পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারায় আরো ৬ শ্রমিক। ওই হত্যাকান্ডের বিচারের দাবিতে আন্দোলন আরো জটিল ও কঠোর আকার ধারণ করে। যা সামাল দিতে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়। পুলিশ এলোপাতাড়ি লাঠি চার্জ ও গুলিবর্ষণ করে। পুলিশের বর্বরোচিত হামলায় ৪ মে’ আরো ৪ শ্রমিককে প্রাণ দিতে হয়েছে। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া শ্রমিক নেতাদের গ্রেফতার করা হয়। ৬ অক্টোবর বিনা বিচারে আটককৃত শ্রমিক নেতাদের ফাঁসি দেওয়া হয়। আর এতে বিক্ষোভ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সারাবিশে^। গড়ে উঠে শ্রমিক জনতার এক বৃহত্তর ঐক্য ও সংহতি। যা ছিল এক নজিরবিহীন ঘটনা। আর সেটাই এখন ইতিহাসের কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
দৈনিক ৮ ঘন্টার কাজের দাবী ইতিমধ্যে বিশে^র অনেক দেশ মেনে নিতে বাধ্য হয়। ১৮৮৯ সাল, ঘটে যায় আরো এক ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৪ জুলাই প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে শিকাগো ট্রাজেডিকে ‘সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করার ঘোষণা করা হয়। যেকোন সংকটে শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। আর সেটা দেখা গেলো মাত্র কিছু দিনের মধ্যেই। ১৮৯০ সাল থেকে প্রতি বছর দিনটিকে মে’ দিবস হিসেবে পালন শুরু করে বিশ^ব্যাপী। কোন যৌক্তিক আন্দোলনই বৃথা যায় না। কোন আত্মত্যাগই বৃথা যেতে পারে না। আর সেটাই প্রমাণ হলো শ্রমিকদের আত্মত্যাগ ও যৌক্তিক আন্দোলনের ফল¯্রুতিতে মে’ দিবস অর্জনের মাধ্যমে।
প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে মে’ দিবস পালন শুরু করে আর্জেন্টিনায়। যা আজ ইতিহাস। আর ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম মে’ দিবস পালন শুরু হয় ১৯২৩ সাল থেকে। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সাল থেকেই মে’ দিবস পালিত হয়ে আসছে। বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো দিনটি’কে সরকারী ছুটি হিসেবে পালিত হয়ে আসছে যথাযোগ্য মর্যাদায়। তবে আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকরা কিছু কিছু দাবি-দাওয়া আদায় করে নিতে সক্ষম হলেও অনেক অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকরা সব সময় আড়ালেই থেকে যাচ্ছেন। অধিকার আদায়ে তারা পিছিয়ে পড়ছেন এবং নির্যাতিত হয়ে আসছেন প্রতিনিয়ত। নির্যাতনের অনেক ঘটনা মিডিয়াতে আসে না। সামান্য কিছু আসলেও প্রভাবশালী হওয়ায় নিয়োগকর্তারা পার পেয়ে যায় সুকৌশলে। রাজধানী’সহ সকল জেলা শহরে গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে প্রায় প্রতিদিনই। কম মজুরিতে খাটানো যায় এবং অধিকার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয় বলে শিশু শ্রমিকতো আছেই বিভিন্ন সেক্টরে। তাছাড়া কৃষি শ্রমিক, দিনমজুর, রিক্সাচালক’সহ ৬০টির বেশী অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের নির্যাতন প্রতিরোধ কিংবা তাদের মজুরির বিষয়টি এখনো সুরক্ষিত বা ফয়সালা হয়নি। বহুদিনের দাবি ও আশ^াস দেয়ার পরও সেটা অনেকটা অবহেলায় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
জীবন দিয়ে ৮ ঘন্টার কাজের অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মে’ দিবসের প্রতিষ্ঠা হলেও আমাদের দেশে ৮০ ভাগেরও বেশী শ্রমিক ৮ ঘন্টার বেশী সময় কাজ করেন বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)। পাঁচটি শ্রমঘন খাতের বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই পরিসংখ্যান দিয়েছে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করে আসা প্রতিষ্ঠানটি। আর তাতে দেখা যায় যে, হোটেল/রেস্তোরা, নিরাপত্তা কর্মী, পরিবহন কর্মী, রি-রোলিং মিলের শ্রমিক, হাসপাতাল/ডায়াগনস্টিক সেন্টারের শ্রমিকদের নিয়ে এই গবেষণা প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হয় শ্রমিকদের নানান অসন্তোষ ও শ্রম বাজারের নানান বৈষম্য।
অনেক প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা সরকারি কোন প্রকার ছুটি ভোগ করতে পারে না সঠিকভাবে। সাপ্তাহিক ছুটি থেকেও বঞ্চিত হয় বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। নিরাপত্তা কর্মীদের মধ্যে ৬৬ ভাগ সাপ্তাহিক ছুটি পান না। ৮৮ ভাগ মে’ দিবসে ও ৮৬ ভাগ সরকারি ছুটির দিনে ছুটি পান না বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পরিবহন শ্রমিকদের ৯০ ভাগ সাপ্তাহিক ছুটির দিনে, ৯৮ ভাগ সরকারি ছুটির দিনে, ৮৪ ভাগ মে’ দিবসে ছুটি পান না। হোটেল শ্রমিকদের ৮৬ ভাগ সাপ্তাহিক ছুটি, ৮২ ভাগ সরকারি ছুটি ও ৮২ ভাগ মে’ দিবসের ছুটিতেও কাজ করেন। রি-রোলিং শ্রমিকদের সাপ্তাহিক কোন ছুটি নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। আর প্রাইভেট হাসপাতালের শ্রমিকদের ৫০ ভাগ সরকারি ছুটিতেও কাজ করতে হয়। সাপ্তাহিক ছুটি নেই ৭২ ভাগ শ্রমিকের।
তবে উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো জাপানে শ্রমিক ও মালিক কেউই কাউকে কোনরূপ অবিশ^াস করে না। কারণ কারখানার মালিকরা কখনও মিথ্যে তথ্য প্রদান করেন না। প্রতিষ্ঠান লাভজনক হলে এর সুবিধা শ্রমিক-মালিক সবাই ভোগ করবে। আর ক্ষতি হলেও একইভাবে শ্রমিক-মালিক সবার ওপর এর প্রভাব পড়বে। ফলে সবাই চেষ্টা করে থাকে যেন কারখানা লাভবান হয়। মালিকরাও বিভিন্নভাবে চুলচেরা বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে কারখানার অবস্থান তুলে ধরেন। ফলে পারস্পারিক বোঝাপড়া ভালো থাকে। কারখানাকে কিভাবে লাভজনক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যায়, তার একটা ঐকান্তিক প্রচেষ্টা জাগ্রত থাকে সব সময় উভয় পক্ষের। মালিক ছাড়া যেমন শ্রমিকের কোন মূল্য নাই, তেমনিভাবে শ্রমিক ছাড়াও মালিকের কোন মূল্য নাই। এই প্রকৃত সত্যকে উপলব্ধি করতে পারলে শ্রমিক-মালিক উভয়ের সম্পর্ক ভালো থাকবে। আর এতে করে উভয় পক্ষই লাভবান হবে সমানভাবে।
মনে রাখতে হবে যে, শ্রমিক-মালিক একে অপরের পরিপুরক। সুতরাং উভয়ের অভিষ্ট লক্ষ্য একই হওয়া উচিত। যেসকল মালিক শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার যতো বেশী মূল্যায়ন করবে সেইসব মালিক ততো বেশী সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। এর ব্যতিক্রম ঘটলে ফলাফলও বিপরীত হতে পারে। একটুখানি শ্রমিক অসন্তোষের কারণে মুহূর্তে কোটি কোটি টাকার ধন-সম্পদের ক্ষতির কারণ হতে পারে। এর বহু নজির দৃশ্যমান। অতএব শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা, প্রণোদনা, বোনাস, ছুটি ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ শ্রমিকদের মনোবল যোগাতে সাহায্য করে থাকে। আর এরকম কাজগুলি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করা উচিৎ। তবেই শ্রমিকদের মধ্যে কারখানার মালিকানা (Ownership) বা আন্তরিকতা প্রতিষ্ঠিত হবে। শ্রমিকদের চাকুরীর নিশ্চয়তা, যোগ্যতানুযায়ী পদায়ন, ন্যায্য মজুরী নির্ধারণ, পদোন্নতি, সংগঠন করার অধিকার ইত্যাদি নিশ্চয়তা শ্রমিকদের কাজের প্রতি উৎসাহ আরো বাড়িয়ে তোলে। সুতরাং মালিকদের বিষয়গুলি খেয়াল রাখা অতিব প্রয়োজন।
পরিশেষে, শ্রমিক-মালিক ঐক্য যদি সুপ্রতিষ্ঠিত হতো, তবে মে’ দিবস বলে হয়ত কিছুই দুনিয়াতে পাওয়া যেতো না। এখনই ভাবতে হবে মালিক ও শ্রমিকদের। যতো রকমের অসন্তোষ ও বৈষম্য আছে তা সমূলে দূরীভূত করার প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নতুন করে ভাবতে হবে শ্রমিকদের অধিকারগুলি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের। দুনিয়ার সকল মজদুর ও মেহনতি মানুষগুলি এক হবে। এগিয়ে যাবে এক নতুন আলোয় আলোকিত করতে পৃথিবীটাকে। জয় হোক মেহনতি মানুষের।

লেখক : কবি, কলামিস্ট ও ঊন্নয়নকর্মী

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।