চাকরি বাঁচাতে ঢাকার রাস্তায় সৌদি প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধারা

ফ্লাইট সমস্যা সমাধানে শুক্রবার পর্যন্ত আলটিমেটাম আজ থেকে ফ্লাইট চালু হবে সৌদি এয়ারলাইনসের অবতরণের অনুমতি পায়নি বিমান

0 28

টিকিটের দাবিতে গতকাল রাজধানীতে সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইনসের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশিরা —ইত্তেফাক
চাকরি বাঁচাতে দ্বিতীয় দিনের মতো গতকাল রাজধানীর রাস্তায় বিক্ষোভ করেছেন সৌদি প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। ফিরতি টিকিটের দাবিতে কাওরান বাজারে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে রাখেন তারা। এরপর প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ শেষে সাত দফা দাবিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাও করেন সৌদি প্রবাসীরা। বিক্ষুব্ধ প্রবাসীরা ফ্লাইটের সমস্যা সমাধানে শুক্রবার পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছেন।

এদিকে বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে বিমান চলাচল পুনরায় চালু করা নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, তার সমাধান করা হয়েছে। ১ অক্টোবর থেকে বিমান বাংলাদেশ এবং আজ ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইনস ফ্লাইট পরিচালনা করবে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে কাওরান বাজারে সৌদি এয়ারলাইনস ঢাকা অফিসের সামনে তারা বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় প্রধান সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র জটের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ তাদের সমস্যার সমাধানের আশ্বাসে সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সৌদি এয়ারলাইনসের বুকিং কার্যালয়ে যান। সেখানে কোনো সুরাহা না হওয়ায় সাত দফা দাবি নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাও করে আবারও বিক্ষোভ করেন তারা।

বিক্ষোভরত প্রবাসীরা জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে যেতে না পারলে তাদের চাকরি হারাতে হবে। কিন্তু তারা সৌদি এয়ারলাইনসের টিকিট পাচ্ছেন না। বিমানের কৃত্রিম সংকটের অভিযোগও তোলেন তারা। জানা গেছে, করোনা ভাইরাস মহামারিতে নিজ দেশে আটকে পড়া সৌদি আরবে কর্মরত বিদেশি কর্মীদের আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কাজে ফেরার বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এরপর থেকে দেশে আটকে পড়া বহু প্রবাসী টিকিটের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন। কয়েকটি চার্টার্ড প্লেন গেলেও তা একেবারেই অপ্রতুল। অনেকের ফিরতি প্লেনের টিকিট থাকলেও সেটি পাচ্ছেন না। সৌদি এয়ারলাইনসের টিকিট বিক্রি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামেন প্রবাসীরা। আন্দোলনকারীরা বলেন, সৌদি এয়ারলাইনসের ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে টিকিট বিক্রি এবং ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ফ্লাইট চালু করার কথা ছিল। কিন্তু সেই কথা রাখেনি তারা। অথচ বহু প্রবাসীর ভিসা ও আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে বা যাওয়ার পথে।

এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, বাণিজ্যিক ফ্লাইট বাতিল করায় দেশে আটকে পড়া সৌদি আরবে কর্মরতদের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কিছুই করার নেই। এ বিষয়ে আমরা বলতে পারব না। এটা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাউদিয়া আজ ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে সপ্তাহে দুই দিন ঢাকা থেকে বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালানোর অনুমতি পেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটির কাছ থেকে গতকাল বিকাল পর্যন্ত ফ্লাই করার অনুমতি পায়নি। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে সৌদি আরবের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পুনরায় চালুর একটা ঘোষণা এসেছিল সেখানকার কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। বাংলাদেশের সরকারি বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসও সৌদি সরকারের শর্ত সাপেক্ষে ফ্লাইট আংশিকভাবে চালু করতে চেয়েছিল। কিন্তু সৌদি আরবের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ সেই অনুমতি বাংলাদেশ বিমানকে দেয়নি। এরপর বাংলাদেশও সৌদি এয়ারের ফ্লাইট চলাচলের অনুমতি বাতিল করে দেয়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস আগামী ১ অক্টোবর থেকে সৌদি আরবে বাণিজ্যিক ফ্লাইট শুরুর অনুমতি পেলেও এখনো ল্যান্ডিং পারমিশন পায়নি।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোকাব্বির হোসেন বলেছেন, সৌদি আরব ১ অক্টোবর থেকে বিমানের বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত প্রদান করেছে, কিন্তু আসন বরাদ্দ আরম্ভ করার আগে ল্যান্ডিং পারমিশন আবশ্যক। ল্যান্ডিং পারমিশন পাওয়া যায়নি। ফলে যাত্রীদের আসন বরাদ্দ আরম্ভ করার জন্য ফ্লাইট এখনই ঘোষণা করা সম্ভব হচ্ছে না। ল্যান্ডিং পারমিশন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফ্লাইট ঘোষণা করা হবে। তিনি বলেন, যে যাত্রীর কাছে সৌদি আরব যাওয়ার ফিরতি টিকিট রয়েছে, শুধু তাদের আসন বরাদ্দ করা হবে। আপাতত নতুন টিকিট বিক্রি করা হবে না। আসন বরাদ্দের বিস্তারিত তথ্য আজ বিমানের ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে। ভিড় এড়ানোর জন্য মার্চ, এপ্রিল, মে এ রকম মাস অনুযায়ী ফিরতি টিকিট ‘রিকনফার্ম’ করা হবে।

সৌদি এয়ারলাইনস ঢাকা অফিস কর্তৃপক্ষ বলছে, এ মাসে মাত্র চারটি ফ্লাইটের অনুমতি মিলেছে। তা আরো বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। গতকাল বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান বলেছেন, এত দিন সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের আকাশপথে যোগাযোগ পুরাপুরি বিচ্ছিন্ন ছিল। বাংলাদেশিদের ফিরে যেতে সাউদিয়া যে কটি ফ্লাইটের অনুমোদন চাইবে, আমরা দেব। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে হযরত শাহজালাল (রা.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গণশুনানি অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। মফিদুর রহমান বলেন, দুই সপ্তাহ আগে সৌদি এরাবিয়ান এয়ারলাইনস আমাদের কাছে অনুমোদন চায়, আমরা অনুমতি দিয়েছি। যদিও আমাদের বাংলাদেশি এয়ারলাইনসও সেদেশে যেতে পারবে—এই শর্তে আমরা অনুমোদন দিয়েছি। আমরা জানতে পেরেছি, যাদের আকামার মেয়াদ আছে তারা যেতে পারবেন। শুধু ভিজিট ভিসা ও ওমরা ভিসায় যাওয়া যাবে না। আমরা জানতে পারলাম, বিমানকে চার্টার্ড ফ্লাইটের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্যিক ফ্লাইটের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। বিমানকে অনুমোদন না দেওয়ায় অনেকেই চাচ্ছিলেন সাউদিয়ার অনুমোদন বাতিল করা হোক, কিন্তু আমরা সিভিল এভিয়েশন থেকে বাতিল করিনি। আমাদের বাংলাদেশি প্রবাসী ভাইদের যাওয়া নিশ্চিত করতে সাউদিয়া ও বিমান যেন চলাচল করতে পারে, সে বিষয়ে কথা বলেছি। আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করব। আমরা সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলেছি।

এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে জানা গেছে, যারা করোনার আগে ছুটি নিয়ে এসেছেন, তাদের কোনো সমস্যা হবে না। তারা দেরি হলেও যেতে পারবেন। অন্তত আরো তিন মাস তাদের সুযোগ থাকবে। এ ব্যাপারে সৌদি রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ সরকারকে আশ্বস্ত করেছেন।

বাংলাদেশ প্রবাসী কল্যাণ পরিষদের চেয়ারম্যান আহমেদ রিয়াজ বলেন, এখন ২০ হাজারের মতো সৌদি প্রবাসী চাকরির ঝুঁকিতে আছেন। তারা ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ফিরতে না পারলে সমস্যায় পড়বেন। তাদের ওয়ার্ক পারিমট থাকবে না। তাই সরকারের উচিত এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে কথা বলা, তাদের জন্য সময় বাড়ানোর ব্যবস্থা করা, এর জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টের ব্যবস্থা করা। তিনি অভিযোগ করেন, বিমানের অবহেলা আর দায়িত্বহীনতার কারণে এই পরিস্থিতি হয়েছে। এর আগে একবার বাণিজ্যিক ফ্লাইটের অনুমোদন দেওয়া হলেও শর্ত ভঙ্গের কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।