সাহস আর সংগ্রামের ‘সাগুফতা কথন’

0 1

ঘড়িতে রাত ৮টা। বনানীর অনেক অফিসই ছুটি হয়ে গেছে। কিন্তু সাগুফতা নেওয়াজের অফিস কক্ষটি দেখে মনে হচ্ছে ভর দুপুর। যেন দুপুর ১২টা। তখনো কর্মচঞ্চল আর চোখে মুখে ক্লান্তিহীন সবাই। একাধিক ফ্যাক্টরি ভিজিট করে এসেও একটুকু ক্লান্ত হননি তিনি। এসেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন বিদেশি বায়ারদের সঙ্গে যোগাযোগে। দেশে থাকলে এভাবেই কাটে সাগুফতা নেওয়াজের প্রতিটি দিন। একই রকম ব্যস্ততা তার দেশের বাইরেও।

এতকিছুর পরও দারুণভাবে সংসার সামলান সাগুফতা। স্বামী, সন্তান ও পরিবারের প্রাধান্য তার কাছে বরাবরই বেশি। তবে কাজের গুরুত্ব সবার আগে। স্বামী কাজী আসিফ নেওয়াজ সাগুফতার ব্যস্ততায় আর এগিয়ে যাওয়ায় অন্যতম সহযোগী। নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল, আর সেই জায়গা থেকেই স্ত্রীকে এগিয়ে দিয়েছেন- এগিয়ে যাবার যাত্রাপথে। সাহস হয়ে সাগুফতার ব্যবসায়ী হওয়ার আত্মবিশ্বাস যোগান জীবনসঙ্গী। জিওডিস নামে একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আসিফ। তার পরামর্শেই চাকরিরত অবস্থাতেই ব্যবসার জার্নিটা শুরু করেন সাগুফতা।

 

 

বাবা মোকাররম হাসান ও মা ডালিয়া হাসানও সব সময় চাইতেন মেয়ে যেন স্বাবলম্বী হয়। শ্বশুর-শাশুড়ির চাওয়াটাও ছিল একই। দুই ভাইয়েরও ছিল সহযোগিতা। তাদের অনুপ্রেরণায় সাগুফতা নেওয়াজ এগিয়ে যেতে থাকেন। নিজের শতভাগ দিয়ে ব্যবসাতে সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করেন সাগুফতা। ছেলে কাজী সারফারাজ নেওয়াজ নীলাদ্রীর নামে ‘নীলাদ্রী সোর্সিং’ বায়িং হাউজ গড়ে তোলেন । আর মেয়ে আফসারা মেহেক নেওয়াজ নীলিমার নামে ‘নীলিমা ট্রেডিং’। বেশ কিছুদিন পরে দুই প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে এনটুএন সোর্সিং লি. নামে গড়ে তোলেন একটি স্বনামধন্য বায়িং হাউজ।

 

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে সম্প্রতি গড়ে তুলেছেন ‘এনটুএন সোর্সিং ইনক’ নামে একটি জয়েন ভেঞ্চার প্রতিষ্ঠান। আর চলতি বছর ২০২২ সালে বাংলাদেশে এনটুএন টেকনোলজি নামে আরও একটি প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু করেছে সাগুফতার হাত ধরে।

সাগুফতা কাজ করে যাচ্ছেন আমেরিকা, ইউরোপের দেশ স্পেন, পর্তুগাল, ডেনমার্ক ও ভিয়েতনামের বায়ারদের সঙ্গে। সাগুফতা যখন আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা, তখনো বিদেশি বায়ারদের সঙ্গে মিটিং করেছেন। অবাক হয়েছেন বিদেশি বায়াররা। সাগুফতা কাজটা হারাতে চাননি। কারণ, কাজটা হারালে দেশের অর্থনীতির ক্ষতি হবে মনে করেছেন তিনি।

 

হুট করেই এ সফলতা আসেনি সাগুফতার। ভিকারুননিসা থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জেনারেল হিস্ট্রিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে একটি ফরোওয়ার্ডিং কোম্পানিতে ক্যারিয়ার শুরু করেন। এরপর দেশি-বিদেশি একাধিক কোম্পানিতে চাকরি করেছেন বেশ কয়েক বছর। ব্যবসার সোপানে যাত্রার আগে জার্মান কোম্পানিতে কান্ট্রি হেডের দায়িত্ব পালন করেন সাগুফতা। র্দীর্ঘ সময়ের চাকরির ক্যারিয়ার থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা ঢেলে দেন তার ব্যবসায়। তারপরও আজকের অবস্থানে আসতে সময় লেগেছে এক যুগেরও বেশি।

 

সাগুফতা মনে করেন, প্রতিটি মানুষের নিজস্ব ব্যক্তিত্বই তার পরিচয়। সমাজের উন্নতির জন্য অবশ্যই নারীর ক্ষমতায়ন প্রয়োজন। প্রত্যেক নারীকে কিছু না কিছু করতে হবে। একজন নারী কী পারবেন, তা ঠিক করতে হবে তাকেই। যেকোনো কিছুর সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখাটা জরুরি। ধৈর্য, সততা, নিষ্ঠা থাকলে যে কেউ এগিয়ে যেতে পারেন। জীবনে সফল হতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই।

কোভিড পরিস্থিতিতে যখন পর্যুদস্ত জনজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব কিছু বন্ধ, চারিদিকে ছাঁটাই আর কর্তন, তখনো কাজ বন্ধ রাখেননি সাগুফতা। নিজে কষ্ট করে হলেও পূর্ণাঙ্গ বেতন-বোনাস দিয়েছেন কর্মীদের। সুখে-দুঃখে পাশে থাকেন সহকর্মীদের। তাইতো তার সব প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কাছে তিনি ‘পারফেক্ট বস’। শুধু বেতন-বোনাস দিয়ে কর্মীদের পাশেই থাকেননি সাগুফতা। কাজ নিয়ে ছুটেছেন অদম্য গতিতে। করোনা অতিমারির মধ্যে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যবিধি মেনে ফ্যাক্টরি ভিজিট করেছেন। ডেলিভারি দিয়েছেন প্রোডাক্ট।

নারী উদ্যোক্তা সাগুফতা এক সময় বিতর্কের সংগঠক ছিলেন। এখনো ভালোবাসেন আবৃত্তি। বই পড়েন নিয়মিত। কাজের প্রয়োজনে ছুটে যান পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। চান নারীরা এগিয়ে আসুক। আরএমজি সেক্টরে নারীদের যে বিশাল অবদান আছে, সে কথা প্রতিনিয়তই মনে করিয়ে দিতে চান সবাইকে। তাই আর সবার মতো গার্মেন্টসের মেয়েদের গামেন্টসকর্মী না বলে সাগুফতা ডাকেন ‘সেলাই দিদিমণি’ বলে।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।