স্বাধীনতার ৫০ বছরেও স্বীকৃতি পায়নি চাটখিলের মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রব

গ্রামে গুজব রটে আমি যুদ্ধে মারা গেছি। মৃত ভেবে মা শিন্নি দিয়ে হুজুর ডেকে আমার জন্য মিলাদ পড়ান।

খুবই মানবেতর দিন কাটছে তার; চিকিৎসার অভাবে ফুলে গেছে দু’পা। হাঁটতে চলতে পারছেন না মোটেই!

0 412

স্বাধীনতার ৫০বছরেও স্বীকৃতি পায়নি চাটখিলের মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রব।

চাটখিল উপজেলার ৯নং খিলপাড়া ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ড, লটপটিয়া গ্রামে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রবের বাড়ি বললে ছোটবড় যে কেউ খুব সহজে দেখিয়ে দিবে তার বাড়ি। সরকারের স্বীকৃতি না পেলেও গ্রামে সবাই তাকে এক নামে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিনেন এবং সেই নামেই ডাকেন।

এর আগেও গণমাধ্যমে ৭১ এর মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রবের মানবেতর জীবনযাপন নিয়ে আলোকিত চাটখিল পত্রিকায় ২০১৫ সালে (অক্টোবর সংখ্যায়) সংবাদ প্রচার হলে স্থানীয় সংসদ সদস্য এইচএম ইব্রাহিম তখনকার ইউএনও (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা) আবরাউল হাসান মজুমদারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।

 

ইউএনও একটি পাকা ঘর এবং দোকান করে দেওয়ার আশ্বাস দিলেও কেবল মাত্র একটি টিনের ঘর করেই সেটা সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু পরবর্তীতে আর কেউই খোঁজ নেয়নি তার।

কেন স্বীকৃতি পায়নি ৭১ এর মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রব? কেমন ছিলো যুদ্ধ এবং পরবর্তী দিনগুলো এসব নিয়ে আলোকিত চাটখিল পত্রিকার আলাপ হয় তার সাথে।

আলোকিত চাটখিল : ৭১ এর এমন কোন স্মৃতি আছে যা এখনও মনে পড়লে খুব অবাক করে?

আবদুর রব : হ্যাঁ! অবশ্যই আছে। আমি মূলত ছিলাম একজন মাঝি। নৌকায় করে মুক্তিযোদ্ধাদের এখান থেকে ওখানে নিয়ে যেতাম। একবার বাড়িতে না বলে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে চলে যাই। কয়েক মাস বাড়িতে আসতে পারিনি।

গ্রামে গুজব রটে আমি যুদ্ধে মারা গেছি। মা শিন্নি দিয়ে হুজুর ডেকে আমার জন্য মিলাদ পড়ান, দোয়া করান। কিছুদিন পর যখন আমি বাড়িতে আসি তখন সবাই আমাকে দেখে খুব অবাক হয়!

এসব শুনে আমি নিজেও অবাক হই। পুরো এলাকায় চারদিকে বেশ হৈচৈ পড়ে।

এ অঞ্চলে পাক বাহিনী প্রচুর মানুষকে হত্যা করে। এখানকার যারা মুক্তিযোদ্ধা ছিলো তাদের কাছেও সেরকম অস্ত্র ছিলো না। একদিন পাক বাহিনী আমার নৌকায় করে অস্ত্রসহ যাবে। আমি মুক্তিযোদ্ধাদের খবর পাঠাই। তখন আমার বেশ ঘনিষ্ঠ ছিলেন জলিল কোম্পানি (জালাল আহমেদ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা)। তিনি মুক্তিযোদ্ধা, তিনি আমাকে খুব ভালো জানতেন, স্নেহ করতেন।

আমি খবর পাঠাই রাতে পাকবাহিনী যাবে। তারা আমাকে বলে দিলেন, বর্ষায় চারদিকে পানি, বিলের মাঝপথে নিয়ে গেলে তারা যখন লাইট জ্বালিয়ে ইশারা দিবেন তখন নৌকা ডুবিয়ে দিতে। আমি সেটাই করি।

 

নৌকা ডুবিয়ে নৌকা ভর্তি অস্ত্র লুট করি আমরা। পরে সেই অস্ত্র মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধে নিয়ে যান। এসব স্মৃতি এখন বেশি মনে পড়ে।

আলোকিত চাটখিল : একটি স্বাধীন দেশের জন্য নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন অথচ সেই দেশেই স্বীকৃতি পাননি! না পাওয়া নিয়ে আক্ষেপ নেই?

আবদুর রব : স্বীকৃতি পাইনি দুঃখ নাই! তখনকার কেউই এখন বেঁচে নাই। তাছাড়া আমার এলাকার সবাই আমাকে মুক্তিযোদ্ধা বলেই ডাকেন।

এই স্বীকৃতি ভাতা, সুযোগ সুবিধার আশায় তখন আমরা কেউই যুদ্ধে যাইনি। নিজেদের একটা দেশ হবে সেই আশাটাই ছিলো বড়, দেশ তো পেয়েছি। এখন নিজের দেশ, নিজের পতাকা।

আলোকিত চাটখিল : মুক্তিযুদ্ধের পর সরকারের তালিকা ভুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেননি?

আবদুর রব : করেছি। লেখাপড়া নাই। ফাঁকফোকর বুঝি নাই। তাছাড়া যাদের সাথে গিয়েছিলাম তারা এখন বেঁচে নাই, যারা আছেন অনেকেই তাদের সম্মান কমে যাবে এই ভয়ে এখন আর আমাকে চিনেন না! না চিনার ভ্যান করে। চিনলেও আবার তারা ১লাখ-দেড় লাখ ঘুষ চায়! আমি কোত্থেকে দিবো টাকা?

যুদ্ধ এবং যুদ্ধের পরবর্তী সময়গুলোও সুখকর ছিলো না। যুদ্ধের পর হঠাৎ চারদিকে গুঞ্জন ওঠে যারা যুদ্ধে গেছে বা তাদের সহযোগিতা করছে তাদের তালিকা হচ্ছে, মেরে ফেলা হবে। আমার মা বেশি ভয় পেয়ে যায়। গোপনে আমার যুদ্ধের টোকেন টা কোথায় যেন ফেলে দেয়, তাই আর আবেদন করতে পারিনি।

ঐসময় একদিন গভীর রাতে গ্রামে হঠাৎ বেশ শোরগোল পড়ে। মা ভয় পেয়ে যায়। আমাকে ঘর থেকে নিয়ে শীতের রাতে কচুরিপানা ভর্তি একটা ডোবায় লুকিয়ে রাখে।

তাছাড়া লেখাপড়া না জানার কারণে করতে পারিনি। এই আরকি-

আলোকিত চাটখিল : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার তো মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অনেককিছুই করে দিলেন, এই সরকারের কাছে আপনার কিছু চাওয়ার নেই?

আবদুর রব : কারো কাছে চাওয়ার কিচ্ছু নেই। এর আগেও সাংবাদিকরা এসেছিলো। নিউজ প্রচার করছে। পরে আমাদের সংসদ সদস্য এইচএম ইব্রাহিম সাহেবের নির্দেশে তখনকার ইউএনও আবরাউল হাসান মজুমদার সাহেব আমার বাড়িতে আসেন। বললেন একটি পাকা ঘর এবং জীবিকার জন্য একটা দোকান নিয়ে দিবেন কিন্তু পরে আমার টিনের ঘরটাই মেরামত করে দিলেন, দোকান টোকান কিচ্ছু দেয়নি।

এখন তো আর কাজ করতে পারি না৷ বয়স হয়ে গেছে। খুব কষ্টে চলতে হয়।

এমপি সাহেব যদি আমাকে সরকারের তরফ থেকে চলার মত নিজের একটা ব্যবস্থা করে দিতো তাহলে ভালো হতো।

আরও পড়ুন

যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে নাম জড়িয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে জুয়েল অভিযোগ এলাকাবাসীর। গড়ে তুলেছে চাঁদাবাজি ও মাদকের আখড়া

নোয়াখালীতে ছাত্রদল নেতা জাহিদের বাড়িতে সন্ত্রাসী হামলা ব্যাপক ভাঙচুর

করোনা প্রতিরোধে সকল ভয়ভীতি ও কুৎসা রটনা থেকে বিরত থেকে করোনা প্রতিরোধে ভ্যাকসিন গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

করোনা ভ্যাকসিন নেন ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।