ভাতা কার্ড দিতে ইউপি চেয়ারম্যানের অর্থ আদায়!

এক হাজার ছয়জন হওয়ায় ব্যাংক হিসাব খুলতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সহযোগিতা চাওয়া হয়

0 ৭৯

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন সমাজসেবা অধিদফতরের মাধ্যমে বয়স্ক, বিধবা ও শারীরিক সমস্যা প্রতিবন্ধীদের ভাতা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় ডাটাবেইজ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে।

১০ টাকার বিনিময়ে সব ভাতাভোগীরা নিজ নামে ব্যাংক হিসাব খুলে ভাতা সুবিধা ভোগ করার কথা থাকলেও প্রতিটি ব্যাংক হিসাব খোলার জন্য ৫শ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। যারা দাবিকৃত টাকা দিতে পারছেন না তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

এমনই অভিযোগ উঠেছে নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার চাপরাশিরহাট ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মহি উদ্দিন টিটুর বিরুদ্ধে।

উপজেলা সমাজ সেবা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চাপরাশিরহাট ইউনিয়নের মোট ১ হাজার ৬ জন বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ভাতা কার্ডের চূড়ান্ত তালিকা করা হয়েছে। লোকজন বেশি হওয়ায় ওই সুবিধাভোগীদের টাকা প্রদানের জন্য একটি করে ব্যাংক হিসাব খুলে দিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি চেয়ারম্যানের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। যার বেশির ভাগ একাউন্ড সোনালী ব্যাংকে খোলা হচ্ছে। এছাড়া উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে কৃষি ব্যাংকেও একাউন্ট খোলা হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানায়, গত ২৩ জুন (মঙ্গলবার) থেকে চাপরাশিরহাট পশ্চিম বাজার জনতা বাজার সড়কের ড্রিম লাইন কাউন্টারে ভেতরে ইউনিয়নের বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ডের চূড়ান্ত তালিকার সুবিধাভোগীদের ব্যাংক হিসাব খুলে দেওয়ার কাজ করছেন চেয়ারম্যানের সহযোগী সাহাব উদ্দিন। নিজে বসে ব্যাংকের ফরম পূরণ করে দিয়ে জন প্রতি ৫শ টাকা করে নিচ্ছে। যদিও চেয়ারম্যান বলেছেন প্রতি ফরমে ২শ টাকার করে নেওয়ার জন্য।

যারা কম দিচ্ছেন তাদের অশালীন ভাষায় গালমন্দ এবং যারা দিতে পারছে না তাদের তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ারও হুমকি দিচ্ছে। টাকা কেন নেওয়া হচ্ছে হিসাব খুলতে আসা কয়েকজন জিজ্ঞেস করলে বিভিন্ন খরচ আছে বলে জানায় সাহাব উদ্দিন। দিন শেষে এই টাকা চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, মঙ্গলবার সকাল ব্যাংকের হিসাব খোলার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, ছবি ও টাকা নিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হয়। সাহাব উদ্দিন ও তার সঙ্গে থাকা লোক একজন একজন করে সিরিয়ালে ডেকে কাগজপত্র নিয়ে ফরমে স্বাক্ষর ও টিপ নিয়ে টাকা নিয়ে যায়।

বিধবা ভাতার কার্ডের হিসাব খোলার জন্য এসে হাতে টাকা নিয়ে লাইনে দাঁড়ানো এক নারীর সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, ‘টাকা-ত দন লাইগবো, ওই এগিন হাডাইবো যে হিয়ার লাই (টাকা দিতে হবে, কারণ কাগজপত্র পাঠাবে)। টিয়া কিল্লাই নের হেতারা জানে বাবু আমরা কি জানিনি, কাগজ-হত্র রেডি কইত্তে লাইগবো কইছে (টাকা কেন নেওয়া হচ্ছে বাবা আমি বলতে পারবো না,  কাগজপত্র প্রস্তুত করতে লাগবে বলছে)।’

বিধবা ভাতার ব্যাংক হিসাব করা এক নম্বর ওয়ার্ড হানু মিয়ার ট্যাক এলাকার এক নারী বলেন, ৩৮০ টাকা নিয়ে একাউন্ট খুলতে গেলে সাহাব উদ্দিন ফরম দেয়নি। পরে বাজারের একজন থেকে ১২০ টাকা ধার করে মোট ৫শ টাকা মিলিয়ে দেওয়ার পর ফরম পূরণ করে দিয়েছে।

ফরম পূরণে ৫শ টাকা করে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে চেয়ারম্যানের সহযোগী সাহাব উদ্দিন বলেন, অত-টাকাতো নেওয়া হচ্ছে না। বর্তমান পরিস্থিতির কারণে ব্যাংকে সবার একাউন্ট করা সম্ভব হচ্ছে না। ১০টির বেশি একাউন্ট ব্যাংক করতে পারবে না। তাই আমরা ফরমগুলো নিয়ে একাউন্টগুলো করে দিচ্ছি। ফরম পূরণ করার পর কেউ ১’ কেউ ২শ টাকা করে দিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ দিচ্ছেনও না। ১০ টাকার একাউন্টের জন্য ব্যাংককে ১০ টাকা দিতে হয়। চেয়ারম্যান একাউন্টগুলো করতে আমাকে সহযোগিতা করতে বলেছে।

চাপরাশিরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহি উদ্দিন টিটু তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সাহাব উদ্দিন আমার দলের কোনো কর্মী না। ব্যাংকের ফরম পূরণ করার কোনো দায়িত্ব সাহাব উদ্দিনকে দেওয়া হয়নি। তিনি ড্রিম লাইন কাউন্টারে কাজ করেন। ফরম পূরণে সাহাব উদ্দিন যদি কোনো টাকা নিয়ে থাকেন তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তিনি আরও বলেন, গত দুইদিন ধরে ফরম পূরণে টাকা নেওয়ার অভিযোগ পেয়ে ড্রিম লাইন কাউন্টারে সাহাব উদ্দিনের ফরম পূরণের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আগামীকাল শুক্রবার (২৬ জুন) থেকে ইউনিয়ন পরিষদে ফরম পূরণের কাজ করা হবে। আমি নিজে বসে থেকে নিজের খরচে ব্যবস্থা করবো।

কবিরহাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, এক হাজার ছয়জন হওয়ায় ব্যাংক হিসাব খুলতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকের ফরম পূরণ করতে কোনো ধরনের টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। যদি কেউ ফরম পূরণে টাকা লেনদেন করে থাকেন তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।