নিম্নমুখী উচ্চশিক্ষা: শিক্ষকরা শিক্ষার চেয়ে রাজনীতিকেই বেশি গুরুত্ব দেন

0

মানুষকে মানুষ হতে হয়। মানুষের মতো হয়ে জন্মালেই মানুষ হওয়া যায় না। এক্ষেত্রে পশুরা বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে। পশুর গর্বে জন্মালেই পশু হওয়া যায়। অর্থাৎ পশুকে পশু হতে হয় না। পশু হতে তাকে কারো কিছু শেখাতে হয় না। কিন্তু, মানুষকে শেখাতে হয়। শিখতে হয়। হাতেখড়ি দিতে হয়। এ কারণে শিক্ষাকে বধ্যতামূলক করা হয় মানুষের জন্য। মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের অন্যতম বিষয় হচ্ছে শিক্ষা। আবার শিক্ষা মানে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক নয়। শিক্ষার অর্থ ও ক্ষেত্র আরো ব্যাপক-বিস্তার।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরেও মানুষকে বিবেক-বুদ্ধিসহ অনেক কিছুর তালিম দিতে হয়। নিতে হয়। প্রতিষ্ঠান সেইক্ষেত্রে শিক্ষাকে শান দেয়। ধারালো করে। বাংলাদেশে শিক্ষা দেয়ার প্রতিষ্ঠানের শেষ নেই। ইউনিয়ন, গ্রাম, পাড়া-মহল্লায়ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অগুণতি। সাক্ষরজ্ঞান বা দু’চার কলম লেখার সক্ষমতাকে শিক্ষা ধরলে বাংলাদেশে এখন শিক্ষার হার শতভাগের কাছাকাছি। শহর-বন্দরের বাইরে মফস্বল পর্যায়েও এখন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তো অজগাঁয়েও দেখা যায়। এগুলোতে শিক্ষার্থীও প্রচুর।

প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক মাড়িয়ে দেশে উচ্চশিক্ষার হার বাড়ছে। তা ম্যালথাসের জনসংখ্যা বৃদ্ধির জ্যামিতিক হারকেও হার মানাতে বসেছে। কিন্তু, কর্মসংস্থান উপযোগী প্রকৃত সাধারণ বা কারিগরী উচ্চশিক্ষার মান ও হার কি বাড়ছে ? ছোট্ট এ প্রশ্নটির আপডেট জবাব মিলছে স¤প্রতি প্রকাশিত উচ্চশিক্ষাবিষয়ক লন্ডনভিত্তিক সাময়িকী ‘টাইমস হায়ার এডুকেশনের ‘ওয়ার্ল্ডস ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিং-২০২০’ রিপোর্টে। তাদের বিশ্বসেরা এক হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামও নেই। তালিকাটির শীর্ষে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্বের সেরা ১ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এ দেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঠাঁই না পাওয়া তারই প্রমাণ। বিশ্বের ৯২টি দেশের এক হাজার ৪০০ বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে করা ওই র‌্যাংকিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গা হয়েছে এক হাজারের বহু পরে। এশিয়ায় সবচেয়ে ভালো করেছে চীন ও জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয় তালিকায়ই স্থান পায়নি। বিশ্বের এক হাজার ৩০০বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের মাত্র একটি বিশ্ববিদ্যালয় থাকা অত্যন্ত লজ্জাকর। তাও সেই বিশ্ববিদ্যালয়টি এগোতে তো পারেইনি, আগের অবস্থানও ধরে রাখতে পারেনি। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এমন অধোগতি মর্মপীড়াদায়ক। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা বলি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। তা বলতে এবং ভাবতে আমাদের বেশ ভালো লাগে। গর্ব জাগে।

তালিকার শীর্ষ দশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সাতটি যুক্তরাষ্ট্রের ও তিনটি যুক্তরাজ্যের। এ সংস্থার চলতি বছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী ৯২টি দেশের ১৩০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে হাজারের পরে। তালিকায় বন্ধু রাষ্ট্র ভারত ও শত্রুরাষ্ট্র পাকিস্থানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পজিশনও ঈর্ষনীয়। তালিকার ৩০০ থেকে ১ হাজারের মধ্যে ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ৬৩টি। আর পাকিস্থানের সাতটি। বলতেই হয় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মান কোথায় ঠেকেছে তার একটা পোস্টমর্টেম রিপোর্টটি। আরো দুঃসংবাদ পাওয়া যায় ২০১৬ সাল থেকে সংস্থাটির চার বছরের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে। এতে দেখা যায়, এ সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়েছে প্রায় ৪০০ ধাপ।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার পরিবেশ, শিখনকর্ম দক্ষতা, গবেষণা, জ্ঞানগত সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক যোগাযোগসহ ১৩টি সূচক ধরে করা হয়েছে র‌্যাংকিংটি। এসব সূচকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর হালদশা একেবারে অজানা-অদেখা নয়। শিক্ষকদের গবেষণা ও প্রকাশনার বদলে রাজনীতির তল্পিবাহক হয়ে সাফল্য অর্জনের ঘটনা এখন মামুলি। এটা যেন দোষের নয়। বরং দক্ষতা-স্মার্টনেস। শিক্ষকরা শিক্ষা ও গবেষণার চেয়ে রাজনীতিকেই বেশি গুরুত্ব দেন। একেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বহু দল-উপদল। লাল-নীল-সাদা কতো রং শিক্ষাগুরুদের! এক দল এগিয়ে গেলে অন্য দলগুলো তাদের টেনে নামায়। সেটা করতে গিয়ে শিক্ষার মান ও পরিবেশ বিঘ্নিত করছেন তারা। এর জের পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর। শিক্ষার পরিবেশের ওপর। এর অনিবার্য পরিণতি শিক্ষার্থীদের মনোযোগও চলে যায় অন্যদিকে। পড়াশোনার বদলে তাদের ব্যস্ততা ভিন্ন কিছুতে। তারা ঘটাচ্ছে নানা অঘটন। বহুদিন থেকেই মাদক-সন্ত্রাসের আখড়া হয়ে গেছে কোনো কোনো ক্যাম্পাস।

শিক্ষা ও গবেষণায় বরাদ্দও অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মানোন্নয়নে রাষ্ট্রের উদাসীনতার অভিযোগও রয়েছে। রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত শিক্ষকরা গবেষণার সময়ই বা পাবেন তখন? অস্বচ্ছতায় নিয়োগ পাওয়া ভিসিসহ শিক্ষকরা শিক্ষাক্রমের কী বুঝবেন। বিনাভোটের মতো বিনাপরীক্ষায় ভর্তি হওয়া ছাত্ররাই মেধার কী সাক্ষর রাখবে? এসব প্রশ্ন এড়িয়ে র‌্যাংকিংয়ে পিছিয়ে থাকার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেছেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং প্রকাশ করে, তারা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেই এসব করে; কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাণিজ্যিক র‌্যাংকিংয়ে বিশ্বাস করে না।’ এ ধরনের ‘ছা, ছপ, ছিঙ্গারা’ ধরনের বক্তব্য তিনি আগেও দিয়েছেন। মানুষ হাসিয়েছেন। বিনোদনের আইটেম হয়েছেন। লজ্জার মাথা কাটার মতো এবার তাতে যোগ করলেন নতুন মাত্রা।

এর আগে, গত মে মাসে একই সংস্থার করা এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিংয়ে ৪১৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও ঠাঁই পায়নি এবং তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ ধরনের র‌্যাংকিংয়ের বিরোধিতা করেছিল। সত্যকে স্বীকার করে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত তাদের স্ব স্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বাড়াতে সচেষ্ট হওয়া। বাইরে থেকে কেউ এসে শিক্ষা, শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের মান উন্নয়ন করে দেবেন না। এ ক্ষেত্রে ঐশ্বরিক কোনো রহমত আশা করাও হবে বাতুলতা। সেই চেষ্টা শুরু করতে হবে প্রাথমিক থেকেই। নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সেটার ফলো আপ ঘটাতে হবে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে।

স্কুল হচ্ছে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের ফাউন্ডেশন তৈরির জায়গা। ভালো শিক্ষার্থী তৈরির প্রথম জায়গাটি হল প্রাইমারি স্কুল। এই ফাউন্ডেশনে ভেজাল থাকলে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ইমারত দুর্বলই থাকবে। নিম্নপর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভালো শিক্ষার্থী তৈরি না হলে উচ্চপর্যায়ে ঘাটতি অবধারিত। নতুন করে ভালো শিক্ষার্থী পয়দা করবে কোত্থেকে? স্কুল-কলেজ পর্যায়ে বাণিজ্যের ঢেউ রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভেজাল বা বাণিজ্যমুক্ত শিক্ষা কল্পনা করা যায় না। এমনিতেই প্রাইমারিতে শিক্ষা ব্যবস্থার কতো কিছিম! সরকারি-বেসরকারি, আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসা, ইংরেজি মাধ্যমের বিদেশি ক্যামব্রিজ ও এডেক্সেল কারিকুলামের শিক্ষা, ন্যাশনাল কারিকুলাম ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, মিশনারি স্কুল, এনজিও পরিচালিত স্কুল এবং কূটনৈতিক মিশন পরিচালিত স্কুল ইত্যাদি। তারওপর একমুখী, গণমুখী, সৃজনশীল, এমসিকিউসহ নানান নানান এক্সপেরিমেন্ট। দিন যতো যাচ্ছে তা কেবল বাড়ছেই। এত রকমের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শিক্ষা নেয়া শিশুরা বড় হচ্ছে চিন্তার জগতে বিশাল তফাৎ নিয়ে।
আয়-আয়ুর সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে দেশ অনেক এগিয়েছে। স্বল্পোন্নত থেকে মধ্যম আয়ের দেশ হয়েছে। মাথাপিছু আয় কয়েক গুণ বেড়েছে। যোগাযোগব্যবস্থায় রীতিমতো বিপ্লব। খাদ্যের পাশাপাশি বিদ্যুত উৎপাদনও ব্যাপক। অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনেক সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। কিন্তু আসল জায়গাটি অর্থাৎ শিক্ষাক্ষেত্রে ক্রমাবনতি বড় উদ্বেগজনক। আমরা উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখছি। উন্নত দেশের অভিজ্ঞতা বলে-সেই স্বপ্ন বাস্তব করতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে কর্মমুখী জ্ঞান জরুরি। সুশিক্ষিত জাতি অপরিহার্য। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে আমরা সেটা দেখছি না। যা ছিল সেখান থেকেও পিছিয়ে যাচ্ছি। তা আমাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে মোটেই অনুকূল নয়। বরং স্বপ্নভঙ্গের রেড অ্যালার্ড।

লেখক : সাংবাদিক/কলামিস্ট
[email protected]

আরও পড়ুন
মন্তব্য
Loading...