চ্যালেঞ্জের মুখে বেসরকারি টেলিভিশন

0 ৮১

গত কিছুদিনে কয়েকটি টিভি চ্যানেলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাংবাদিকের চাকরি হারানোর ঘটনায় এক অজানা আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্টদের মধ্যে। উদ্যোক্তারা টিভি স্টেশনগুলো চালাতে গিয়ে সাংবাদিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদানসহ বিভিন্ন খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন। হাতেগোনা কয়েকটি বাদে প্রায় টিভি চ্যানেলের মালিকদের ভর্তুকি দিয়ে এসব খরচের জোগান দিতে হচ্ছে। ফলে দেশের ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার সাংবাদিকদের কর্মহীন হয়ে পড়ার অজানা আশঙ্কা পিছু ছাড়ছে না।

ক’দিন আগে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মালিকদের সংগঠন অ্যাটকো এবং ব্রডকাস্ট জার্নালিস্টদের সংগঠন বিজেসি এই সংকট মোকাবেলায় যৌথ মতবিনিময় সভা করে। এর আগে ৩০ মার্চ শিল্পকলা একাডেমিতে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার ‘সংকটে বেসরকারি টেলিভিশন’ শীর্ষক এক সেমিনারের আয়োজন করে। যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। তথ্যমন্ত্রী দেশি চ্যানেলগুলোর আর্থিক সংকট মোকাবেলায় দেশের বিজ্ঞাপনগুলো বিদেশি চ্যানেলে প্রচার না হওয়ার ওপর গুরুত্ব প্রদান করেন। এমন সংকট মোকাবেলার জন্য তিনি বিদেশি চ্যানেলে যাতে দেশি বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনাও দিয়েছেন। অন্যদিকে ২ এপ্রিল মঙ্গলবার বিকেলে সচিবালয়ে তিনি এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘দেশের টিভি চ্যানেলগুলো যে পরিমাণ বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন পাওয়ার কথা, বর্তমানে তা পাচ্ছে না। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে দেশি বিজ্ঞাপন বাবদ ৫০০ থেকে এক হাজার কোটি টাকা অন্য দেশে চলে যাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিদেশি চ্যানেলগুলো বিজ্ঞাপনমুক্ত বা ক্লিন-ফিড হিসেবে অথবা ফিল্টার করে সম্প্রচার করতে হবে। ২০০৬ সালের কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক আইনের ১৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী বিদেশি কোনো টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচার করার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এতদিন এ আইনটি পালন করা না হলেও আমরা এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি, দেশি টিভি চ্যানেলগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে আইনটি কার্যকর করা হবে।’

১০ এপ্রিল তথ্যমন্ত্রী সচিবালয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল অনার্স-অ্যাটকোর সঙ্গে মতবিনিময়কালে বেআইনিভাবে বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধে সর্বোচ্চ দুই বছর শাস্তি, অর্থদণ্ড ও লাইসেন্স বাতিলের কথা বলেন। একই সঙ্গে যাদুভিশন এবং নেশনওয়াইড মিডিয়াকে বেআইনিভাবে বিদেশি চ্যানেল বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধে চূড়ান্তভাবে সতর্ক করেন। এদিকে ১১ এপ্রিল কেবল অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (কোয়াব) বৈঠকে তথ্যমন্ত্রী কেবল নেটওয়ার্ক ডিজিটালকরণ এবং প্রতিষ্ঠার ক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের চ্যানেল রেখে বিদেশি চ্যানেল রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। কেবল অপারেটরদের পক্ষ থেকেও টিভি কেবল ব্যবসাকে শিল্প, সেটবক্স শুল্ক্কমুক্ত হিসেবে আমদানির অনুমতিসহ বেশ কয়েকটি দাবি মন্ত্রীর কাছে উত্থাপন করা হয়।

একসময় বাংলাদেশে ঘর বিনোদনে শুধু বাংলাদেশ টেলিভিশন থাকলেও যুগের চাহিদা এবং তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে বর্তমানে দেশে বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সংখ্যা এখন ৩০টি। তবে অনুমোদনপ্রাপ্ত হয়ে আছে মোট ৪৪টি চ্যানেল। সংবাদ দেখা থেকে শুরু করে দর্শকদের বিনোদনের বড় অংশই পূরণ করে থাকে বেসরকারি টিভিগুলো। আশির দশকের শেষ লগ্নে দেশে টেলিভিশন ভার্চুয়াল জগতের একাকিত্বের অবসান ঘটায় বেসরকারি চ্যানেলগুলো। ‘৯৮ সালে ড. মাহফুজুর রহমানের উদ্যোগে এটিএন বাংলা প্রথম বেসরকারি টিভি চ্যানেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এরপর একেক করে চ্যানেল আই, ইটিভি, এনটিভি, বাংলাভিশন, বৈশাখী টিভি, আরটিভি, মাছরাঙ্গা টিভিসহ নানা চ্যানেলের আগমন ঘটে। সর্বশেষ একাত্তর, যমুনা, নিউজ টোয়েন্টিফোর, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন, ডিবিসি চ্যানেল দর্শকদের দোরগোড়াতে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।

এ কথা সত্য যে, যখন থেকে দেশে বেসরকারি টিভি চ্যানেলের যাত্রা শুরু হয়, তারপর থেকেই ভারতীয় চ্যানেলগুলোর সঙ্গে এক মহাচ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে এসব টেলিভিশনকে। বর্তমানে ফ্রি এবং পে-চ্যানেল মিলে প্রায় ৩০টির অধিক ভারতীয় চ্যানেল দেখতে পায় বাংলাদেশের দর্শকরা। ভারতীয় চ্যানেলের প্রভাব নিয়ে অনেক কথাবার্তা, মিছিল-মিটিং, দেনদরবার হলেও আজ পর্যন্ত এর কোনো সুষ্ঠু বা দৃশ্যমান সমাধান হয়নি। রাষ্ট্রায়ত্ত বিটিভি, বিটিভি ওয়ার্ল্ডসহ বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো প্রতিদিন সংবাদ, খেলাধুলা, টক শো, সিনেমা, বিতর্ক, নাটক, বিষয়ভিত্তিক অনুষ্ঠান, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানসহ নানা ধরনের বৈচিত্র্যময় অনুষ্ঠান প্রচার করে থাকে। দর্শকদের পরিতৃপ্ত করতে চ্যানেলগুলোর প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তারপরও আমাদের কিছু কিছু দর্শকের ভারতীয় টেলিভিশনগুলোর বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রতি একধরনের আকর্ষণ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নারী দর্শকদের বৃহৎ অংশ জি বাংলা, স্টার জলসা, ইটিভি, হিন্দি চ্যানেল জিটিভি, স্টার প্লাস- এসব টিভি চ্যানেলের প্রতি অতিমাত্রায় আসক্ত।

আমাদের দেশে ভারতীয় টিভি চ্যানেলের প্রবেশ অবারিত থাকলেও ভারতে আমাদের টেলিভিশন প্রচারে রয়েছে নানা কঠিন শর্ত ও প্রতিবন্ধকতা। বছরপ্রতি মাত্র দেড় থেকে দুই লাখ টাকা ফি প্রদান করলেই একটি ভারতীয় টিভি চ্যানেল বাংলাদেশে ডাউনলিংক করা যায়। অথচ ভারতে বাংলাদেশের একটি টিভি চ্যানেল প্রদর্শন করতে গেলে শুধু বড় ধরনের অর্থ প্রদানই নয়, ভারতীয় কোম্পানি আইন ১৯৫৬ অনুসারে নিবন্ধিত কোনো কোম্পানির মাধ্যমে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হয়। একই সঙ্গে পাঁচ কোটি টাকার মতো ফি প্রদান করতে হয়। এখন পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে টেলিভিশন সম্প্রচারে ফি প্রদানে বৈষম্য রয়েই গেছে।

এদিকে কথিত টিআরপি বা টেলিভিশন রেটিং পয়েন্ট জরিপও বেশ কিছু বেসরকারি টেলিভিশনকে বিপদে ফেলেছে। টিআরপি জরিপে পিছিয়ে থাকার কারণে অনেক টিভি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিজ্ঞাপন পায় না। সবশেষে তাই খরচ কমাতে কর্মী ছাঁটাই করার অমানবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। টিআরপি নিয়ে নানা অস্বচ্ছতার অভিযোগ পুরনো। টিআরপি যা কোনো টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তা নির্দেশ করে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, টিভি অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তা নিয়ে কৌশলে পক্ষপাতমূলক তথ্য পরিবেশন করা হয়। টিআরপির উদ্দেশ্যমূলক তথ্য পরিবেশনের কারণে এ পর্যন্ত অনেক টেলিভিশন, নির্মাতা, প্রযোজক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। টেলিভিশনের উদ্যোক্তা, কলাকুশলীরা বহুবার টিআরপি স্বচ্ছতা নিয়ে জোর আপত্তি তুললেও এর সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য কোনো সুরাহা হয়নি। তাই সংশ্নিষ্টরা মনে করেন, টিআরপির জরিপ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে সবাই বয়কট করা উচিত। একই সঙ্গে দেশি চ্যানেলগুলোর সিরিয়ালের ক্রম চ্যানেলের প্রতিষ্ঠাকালীন তারিখ অনুযায়ী করার উদ্যোগ গ্রহণ করাটাও এখন জরুরি। আবার ডাবিংকৃত বিদেশি সিরিয়াল নিয়েও আপত্তি রয়েছে। এখন কিছু কিছু টেলিভিশনে ডাবিংকৃত বিদেশি সিরিয়াল দেখানো রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। অনেক চ্যানেলে বিদেশ থেকে কম দামে কিনে আনা এসব সিরিয়াল দেখানো হয়। এতে করে দেশি কলাকুশলী, নির্মাতাসহ অন্য টিভি মালিকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ডাবিংকৃত বিদেশি সিরিয়াল নীতিমালা তৈরি করে বন্ধ করে দেওয়াটা এখন সময়ের দাবি।

এদিকে আবার এখন পর্যন্ত বিজ্ঞাপনের বাইরে বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর আর কোনো বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি হয়নি বাংলাদেশে। এই খাতে সরকারের কোনো ধরনের প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থাও নেই। তবে কেবল অপারেটররা দর্শকদের কাছ থেকে টেলিভিশনের বিভিন্ন কনটেন্ট প্রদর্শন করে যে অর্থ উপার্জন করে, তার ন্যায্য একটা অংশ বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে প্রদান করা উচিত। যে কথা সম্প্রতি খোদ তথ্যমন্ত্রীও দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন। সারাদেশে এখন কেবল সংযোগের সংখ্যা দুই কোটির বেশি। এই দুই কোটি গ্রাহক কমবেশি প্রতিমাসে কেবল সংযোগদাতাকে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা করে প্রদান করছে। সেই হিসাবে কেবল অপারেটররা মাসে ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা দর্শকদের কাছ থেকে পেয়ে থাকেন। কিন্তু এই আয়ের কোনো ছিটেফোঁটা অংশ পান না টেলিভিশন চ্যানেলের মালিকরা, যা নিয়ে এখন তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের বিতর্ক। এই বিতর্ক এড়িয়ে বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে কেবল অপারেটরদের উপার্জনের একটা ন্যায্য অংশ টিভি মালিকদের শেয়ার করা উচিত।

সবশেষে বলতে চাই, দেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো এখন যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকার, কেবল অপারেটরসহ সব স্টেকহোল্ডারকে ঐকমত্যে আসা প্রয়োজন। তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক, সাংবাদিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী, কেবল অপারেটরসহ সংশ্নিষ্ট সবাইকে ভীষণ সংকটের মুখোমুখি হতে হবে। আর্থিক দৈন্যতায় বন্ধ হয়ে যেতে পারে আরও কিছু কিছু টিভি চ্যানেল। আশা করা যায়, অ্যাটকোর নবনির্বাচিত সভাপতি মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বেসরকারি টেলিভিশনগুলোর টিকে থাকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। তাই দেশি চ্যানেলে বিদেশি বিজ্ঞাপন বন্ধ, ডাবিং সিরিয়াল প্রচার না করা, বিজ্ঞাপন বৈষম্য কমানো, কেবল অপারেটর কর্তৃক দর্শক থেকে প্রাপ্ত অর্থ টিভি মালিকদের সঙ্গে সমভাবে বণ্টন করাসহ অনৈতিক প্রতিযোগিতা বন্ধ করলে বাংলাদেশে বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এগিয়ে যাবে বলে সবার বিশ্বাস।

চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি

আরও পড়ুন
মন্তব্য
Loading...