করোনা: বিধি পালন হোক একনিষ্ঠতা অপরিহার্য

0 47

মানুষ ও বসতির সামাজিক দূরত্ব সংকটে করোনার হালচিত্র প্রতিদিনেই উলোটপালোট হচ্ছে। চারদিকে হাহাকার দেখে অস্থিরতা বেড়েই চলছে। বুকের কোণে শ্বাস ফেলে যায় অনবরত, কত অশ্রুবিন্দু চোখের কোণে ঠাঁই করে নেয়, বয়স ছাড় দেয় না কানাকড়িও। হাত ধরে নিয়ে চলে যাচ্ছে কবরের দিকে।

করোনার কারণে সবখানে দেখা যাচ্ছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, তাই চলছে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম। বাসায় বসে অনেকে অফিসের কাজ সারছেন। শরীর চর্চাও চলছে বাসায় বসে। কেনাকাটায় নির্ভরতা বেড়েছে অনলাইনের ওপর। প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে চোখে পড়ার মতো।

মুল কথায় যাওয়ার আগে একটি কথা বলে রাখি, আমরা জানি করোনা কোন মাধ্যমে ছড়ায়। করোনা রোগীর থুতু, কাশি, লালা কিংবা চোখের পানি দিয়ে করোনা ছড়ায়। এগুলো আপনার নাক, মুখ চোখের পথ দিয়ে না ঢুকতে দিলে করোনা হবার নয়। শুধুমাত্র নাক, মুখ, চোখে বাহিরের লালা, থুতু, চোখের পানির সাথে যাওয়া ভাইরাস থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলেই আপনি করোনা মুক্ত থাকতে পারেন।

করোনা থেকে সুরক্ষিত থাকতে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনসহ প্রয়োজনীয় পরামর্শ স্বাস্থ্য অধিদফতরের করোনাবিষয়ক নিয়মিত হেলথ বুলেটিনে প্রতিদিনেই শুনি, সামাজিক দূরত্ব বজায় ও স্বাস্থ্য বিধি মেনেই চলাচল করার কথা।

করোনাভাইরাস নিয়ে নিয়মিত তথ্য প্রদানকারী অনলাইন পোর্টাল ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য বলছে, বিশ্বে একদিনে সাড়ে ৮ হাজার মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। তবে এটি কমে এখন সাড়ে তিন থেকে চার হাজারে নেমে এসেছে। অধিকাংশ দেশেই মৃত্যুর সংখ্যা কমে আসছে। অথচ বাংলাদেশে সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই এখন বাড়ছে। হয়তো একদিন আমাদের দেশেও কমে আসবে। আমরা জানি, দেশে ৮ মার্চ প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। এরপর ধীরে ধীরে সারাদেশে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। দিনে দিনে শনাক্তের পাশাপাশি মৃত্যুও বাড়তে থাকে। এতো মৃত্যু দেখেও আমাদের চৈতন্য ফিরছে না।

করোনাভাইরাস একদিকে যেমন পৃথিবীকে মনুষ্যত্ববোধ চিনিয়ে দিয়েছে, তেমনই অমানবিকতার নজিরও রেখে গেছে, এখনও যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের সচেতনতারও অনেক ঘাটতি আছে। কুসংস্কার থেকে শুরু করে নিয়ম না মানার প্রবণতা আমরা লক্ষ্য করেছি। এর ফলে আমরা অনেক মানুষকে যেমন হারিয়েছি, তেমনই লাখো মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। এমনকি এখন করোনাভাইরাস ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। এমন অবস্থার পরও আমরা সঠিকভাবে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবেলার তেমন কোনো পরিকল্পনা লক্ষ্য করছি না।

দিনের বেলা বের হলে রাস্তাঘাটে মানুষের চলাচল দেখলে এমনই মনে হয়। এত আক্রান্তের সংখ্যা দেখেও জনসাধারণ খুব কেয়ারলেস চলাচল করছে। ভাবখানা এমন যে, এগুলো শুধুই কিছু সংখ্যা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে আড্ডা চলছে, সন্ধ্যার পর পাড়া-মহল্লার বিভিন্ন জায়গায় দল বেঁধে আড্ডার দৃশ্য চোখে পড়ছে। এদের মধ্যে অনেকেরই মাস্ক থাকে না। আমরা যদি এভাবে চলতে থাকি সরকার বা প্রশাসন কত চেষ্টা করবে। তাদের চেষ্টা, আন্তরিকতার অভাব নেই। কিন্তু আমাদের এমন অবস্থা দেখে তারা অনেক সময় হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেন। আমরা যদি এখনও সচেতন না হই তবে কার কি করার আছে? আমরা কেন একটু চিন্তা করি না? নিজেদের কিছু হলে কারোই কিছু আসবে-যাবে না। যার কিছু হবে তার পরিবারই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বের হওয়া খুব জরুরী হলে তা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে করতে হবে। বাজার বা জনসমাগমের জায়গায় যেতে হলে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এই সতর্কতার বিষয়ে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়ার কোন সুযোগ নেই। এই সতর্কতা প্রতি মুহুর্তে, প্রতিক্ষণে আমাদের করতেই হবে আগামী কয়েক মাস।

আমাদের মনে রাখতে হবে, মানুষ আছে বলেই তো রাষ্ট্র। দেশ-সরকার সবই তার অংশ মাত্র। মানুষ না থাকলে কিছু থাকে না। আর আজ সেই মানুষ দেশে-বিদেশে বড় অসহায়। মানব সভ্যতার কতকিছুই না পরিত্যক্ত এখন। চেষ্টার কমতি নেই তবুও বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি। এই করোনা মহামারির কারণে বিশ্বজুড়ে অনিবার্য হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক মহামন্দা। বিশ্ব কৃষি ও খাদ্য সংস্থা ইতোমধ্যেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে এ মহামন্দার কবলে পড়ে বেকার হবে কোটি কোটি মানুষ, ক্রয় ক্ষমতা হারাবে তারা। মারাত্বকভাবে ব্যহত হবে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা-যার অনিবার্য পরিণতি দুর্ভিক্ষ। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিনিয়ত আমাদেরকে সেই সতর্কবানীই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন।

সবাইকে সচেতনভাবে, দায়িত্বশীলতার সঙ্গে প্রতিরোধমূলক যা যা উপায় অবলম্বন করা দরকার তাতে শামিল করতে পারলেই করোনার ব্যাপক বিস্তার রোধ ও ক্ষয়ক্ষতি কমানো বা থামানো যাবে। আমাদেরকে এসময় বৈশ্বিক উদাহরণ থেকে প্রতিনিয়ত শিক্ষা নিতে হবে যে কিভাবে বৈশ্বিক সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সমন্বিতভাবে এই সমস্যাকে মোকাবিলা করা যায়। তবে সেক্ষেত্রে সবার আগে প্রয়োজন নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর সদিচ্ছা।

আমরা জানি আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এমন ভঙ্গুর; যাতে সঠিক চিকিৎসা পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। করোনাভাইরাস যে ক’দিন স্থায়ী হোক না কেন, যার যার অবস্থান থেকে সচেতন হওয়া এবং নিয়ম মানার বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে সতর্কতা, সতর্কতা এবং সতর্কতা মেনেই জীবন চালাতে হবে। এছাড়াও মনে রাখতে হবে, করোনায় মানসিক সুস্থতা অতীব জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন পরিবেশ থেকে মানবিক আচরণ। দেশে-বিদেশে করোনা নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময় ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা ও ক্ষয়ক্ষতির বেহাল চিত্র দেখে আস্থাহীনতায় আতঙ্ক, আশঙ্কা বেড়েই চলেছে যা মানসিক অশান্তির কারণ। ভীত হয়ে মানসিক রোগী হবেন না। মৃত্যুর চেয়ে সত‍্য কিছুই নাই। পৃথিবীতে জন্ম নিলে মরতে হবেই। করোনা থেকে বাঁচতে জীবনে একবারই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করেন ভয়ে বারবার না। মনে রাখবেন জীবন সুন্দর তবে সেটা কেবলমাত্র উপভোগ করতে পারলেই!

এ সময় মানসিক শান্তি বা মনের বল করোনার মতো ভয়াবহ মহামারি মোকাবিলার জন্য জরুরি। করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে জয়লাভ করার জন্য আমরা প্রত্যেকই হতে পারি একেকজন প্রকৃতযোদ্ধা। এজন্য দেশপ্রেমিক, সৎ, দক্ষ ও সাহসী নেতা, সমাজকর্মী, নিবেদিত প্রাণ স্বাস্থ্যকর্মী, কর্মঠ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, নির্ভীক সংবাদকর্মী ও উদয়াস্ত স্বেচ্ছাসেবক হওয়ার প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র দরকার ‘ঘরে থাকা, ঘরে থাকা এবং ঘরে থাকা’। আপনার সুরক্ষার জন্য চিকিৎসক, প্রশাসন, পুলিশ, সংবাদকর্মী, ব্যাংকার, নিত্যপ্রয়োজনীয় কিংবা ঔষধের দোকানদার সবাই জীবন বাজি নিয়ে বাইরে থাকছে। সেই আপনিই কেন বাইরে? আসুন যেভাবেই হোক ঘরে থাকি এবং এই মরণব্যাধিকে পরাজিত করি। একদিন আতঙ্কের ঘোর কেটে গিয়ে উদ্ভাসিত হবে জীবন সৌন্দর্যময় আলোকোজ্জ্বল দিগন্ত।

লেখক: চেয়ারম্যান, এলবিয়ন গ্রুপ।

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।