ইটভাটা এখন ফুলের বাগান

0 10

ইটভাটা এখন ফুলের বাগান
লক্ষ্মীপুর: যেখানে একসময় দিন-রাত আগুন জ্বলতো, ধুলোবালিতে বিবর্ণ থাকতো ঘোটা এলাকা। সেখানে আজ সবুজের সমারোহ।

কাঠ পোড়া গন্ধ আর ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসার পরিবর্তে প্রাণ ভরে নিশ্বাস নিতে অক্সিজেনের কমতি নেই। আশপাশে বিশুদ্ধ বাতাস। সজীব-সতেজ জীববৈচিত্র্য। ফুটে রয়েছে নানান জাতের হাজারো ফুল। ছড়াচ্ছে সৌরভ এবং সুবাস।
এটি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ এলাকার ওয়াপদা অফিস সংলগ্ন পরিত্যক্ত একটি ইটভাটার চিত্র।

ভাটায় ইট পোড়ানোর পরিবর্তে এখন সবুজ বেষ্টনি তৈরি করা হয়েছে। সেখানে একটি নার্সারি তৈরি করে বিবর্ণ ভাটার পুরো চেহারা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ পাল্টে দিয়েছে ওই এলাকার আনোয়ার হোসেন ও মোর্শেদ নামে দুই সহোদর।

ইটভাটার জমিতে এখন ফলদ, বনজ, ঔষধি এবং হরেক রকমের ফুল গাছের সমারোহ। সবুজে সবুজে ভরে গেছে পুরো মাঠ। ফুলে ফুলে বসছে মৌমাছি-প্রজাপতি, রাতে হয় জোনাকির খেলা।

বন্ধ ইটভাটার জায়গায় নার্সারি গড়ে তোলার এমন পরিকল্পনাকারী দুই সহোদরের বাড়ি ওই এলাকার আব্দুল্লাহপুর গ্রামে। তাদের প্রবল ইচ্ছাশক্তিতে ফুল ফুটেছে এক যুগ ধরে পড়ে থাকা বাড়ির পাশের ইটভাটায়। স্বল্প পুঁজি নিয়ে শুরু করা দুই ভাইয়ের মালিকানাধীন ‘আনোয়ার নার্সারি’ এখন লাখ লাখ টাকা আয়ের হাতছানি দিচ্ছে।

সবুজে ঘেরা নার্সারিতে বর্তমানে ফুল, ফল ও ঔষধি গাছের ব্যাপক সমাহার রয়েছে, যা মুগ্ধ ও আকৃষ্ট করছে স্থানীয় বাসিন্দা, ক্রেতা ও নতুন উদ্যোক্তাদের। এখানে কাজ করে ১০ জন শ্রমিকেরও সংসার চলছে।

জানা যায়, লক্ষ্মীপুর-রামগতি সড়কের ভবানীগঞ্জ এলাকার ওয়াপদা অফিস সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত আনোয়ার নার্সারি। সদরের উত্তর তেমুহনী থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে নার্সারি। সেখানে যেতে গাড়িতে সময় লাগে মাত্র ১০ মিনিট। ঢাকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছেড়ে ২০০৯ সালে মোর্শেদ তার বেকার ছোট ভাই আনোয়ারকে সঙ্গে নিয়ে এ শুরু করেন নার্সারি।

প্রথমে দেড় একর জমি ইজারা নিয়ে দুই লাখ টাকা পুঁজিতে শুরু করেন এই ব্যবসা। প্রতিদিন এখানে উৎপাদিত বিভিন্ন ফুল, ফল ও ঔষধি গাছ বিক্রি করে ১৫-২০ হাজার টাকা আয় হয় দুই ভাইয়ের। ব্যয়ের তুলনায় আয় দ্বিগুণ হওয়ায় বর্তমানে তাদের পুঁজি দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ টাকায়। সরকারি-বেসরকারি সুযোগ-সুবিধা পেলে ব্যবসার আরও প্রসার ঘটতো বলে জানান সফল এই নার্সারির মালিক।

নার্সারিতে ফলের মধ্যে ড্রাগন, ডুমুর, ব্ল্যাকবেরি, মালবেরি, রাম ভূটান, পাসিমন, স্ট্রবেরি পেয়ারা, আম, জাম, ডালিম, আনার, আপেল, মাল্টা, কমলা, থাই জাম্বুরা, পেঁপে, সফেদা, আমলকি, বেল ও কাশমেরী কূলসহ নানা জাতের শতাধিক দেশি-বিদেশি ফল গাছ রয়েছে। এসব গাছের মূল্য ৫০ টাকা থেকে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত রয়েছে। ফুলের মধ্যে রয়েছে ইন্ডিয়ান কেনা, জাপানি চেরি ফুল, চাইনিজ টগর, করবী, ভেলভেটসহ নানা জাতের দেশি-বিদেশি ফুলের চারা। এছাড়া নানা জাতের কাঠ ও ঔষধি গাছের চারা রয়েছে বলে জানা যায়।

এদিকে ভাটাটিও প্রকৃতিকভাবে সেজেছে। ভাটার পেছনে রয়েছে কাশফুলের বাগান।

এসব গাছের বিশাল ভাণ্ডার দেখতে ও কিনতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন সৌন্দর্য ও গাছপ্রেমীরা। তারাও এখানে এসে মুগ্ধতার কথা প্রকাশ করে স্বল্পমূল্যে গাছ কেনার কথা জানান।

স্থানীয়রা বলছেন, আনোয়ার নার্সারি এই এলাকার জন্য একটি দৃষ্টান্ত। নার্সারিটি দেখে বেকার যুবকরা আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

কথা হলো নার্সারির মালিক আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, প্রায় ১৬ বছর আগে রাস্তার পাশে গড়ে উঠেছিল ইটভাটা। বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি ও পর্যাপ্ত মাটির অভাবে ইট পোড়ানো বন্ধ রয়েছে। সেই ভাটার পাশে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়েছে নার্সারি। সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেলে আরও ভালো কিছু করা সম্ভব বলে জানান তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দা ফরহাদ হোসেন বলেন, এপাশ দিয়ে যেতে হলে একসময় ধুলোবালি এবং দুর্গন্ধের কারণে নাকে হাত দিয়ে হাঁটতে হতো। এখন চিত্রটা পুরোপুরি বিপরীত। ভাটার নার্সারির দিকে এখন তাকিয়ে থাকতে হয়। সবার দৃষ্টি কেড়েছে নার্সারিটি।

ভবানীগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল হাসান রনি বলেন, দুই ভাইয়ের গড়ে তোলা নার্সারি এলাকার চেহারা পাল্টে দিয়েছে। ভাটা চলাকলীন সময়ে দুর্গন্ধে এখান দিয়ে পথচারীদের চলাচলে কষ্ট হতো। আর এখন ফুলের সৌরভ নিয়ে আনন্দ উপভোগ করতে করতে চলাচল করে পথচারীরা। বিবর্ণ ইটভাটা সবুজে ছেয়ে গেছে, ছড়াচ্ছে ফুলেল সৌরভ। দুই ভাইয়ের এ উদ্যোগকে আমি সাধুবাদ জানাই।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।